স্লো ব্লিঙ্ক: বিড়ালের 'স্মাইল' যা মানুষের সাথে বন্ড বাড়ায়

আপনার বিড়াল কি কখনো আপনার দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে আবার খুলে? এটা দেখে মনে হয় যেন সে আপনাকে একটা মিষ্টি হাসি দিচ্ছে! অনেক বিড়ালপ্রেমী এই আচরণকে "ক্যাট কিস" বা "বিড়ালের হাসি" বলে থাকেন। কিন্তু এটা শুধু একটা কিউট অভ্যাস নয় – এটা বিড়ালের ভাষায় একটা গভীর বার্তা: "আমি তোমাকে বিশ্বাস করি এবং তোমার সাথে নিরাপদ বোধ করি।"

এই আর্টিকেলে আমরা জানবো স্লো ব্লিঙ্ক কী, কেন বিড়ালরা এটা করে, বিজ্ঞান কী বলে, কীভাবে আপনি নিজে এটা করে আপনার বিড়ালের সাথে বন্ড আরও মজবুত করতে পারেন, এবং আরও অনেক কিছু। যদি আপনি একজন বিড়ালের মালিক হন বা বিড়ালপ্রেমী হন, তাহলে এই পোস্ট আপনার জন্যই!

image source

স্লো ব্লিঙ্ক কী? বিড়ালের ভাষায় এর অর্থ কী?

স্লো ব্লিঙ্ক হলো বিড়ালের চোখের একটা বিশেষ আচরণ। এতে বিড়াল ধীরে ধীরে চোখ অর্ধেক বন্ধ করে, কয়েক সেকেন্ড ধরে রাখে, তারপর আবার ধীরে ধীরে খুলে। এটা সাধারণ ব্লিঙ্ক থেকে আলাদা – সাধারণ ব্লিঙ্ক খুব দ্রুত হয়, কিন্তু স্লো ব্লিঙ্কে চোখ প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় এবং এটা ইচ্ছাকৃত।

বিড়ালের জগতে, সরাসরি চোখে তাকিয়ে থাকা (স্টেয়ারিং) প্রায়শই আগ্রাসন বা চ্যালেঞ্জের লক্ষণ। কিন্তু স্লো ব্লিঙ্ক করে বিড়াল বলে, "আমি কোনো হুমকি নই। আমি শান্ত এবং তোমার সাথে ভালো বোধ করছি।" এটা বিড়ালের ট্রাস্ট এবং অ্যাফেকশনের একটা শক্তিশালী সিগন্যাল। যখন আপনার বিড়াল আপনাকে স্লো ব্লিঙ্ক করে, তখন সে বলছে যে আপনার উপস্থিতিতে সে নিরাপদ এবং সুখী।

বিজ্ঞান কী বলে? সাসেক্স ইউনিভার্সিটির গবেষণা

অনেকদিন ধরে বিড়ালপ্রেমীরা এটা লক্ষ্য করেছেন, কিন্তু ২০২০ সালে ইউনিভার্সিটি অফ সাসেক্স এবং পোর্টসমাউথের বিজ্ঞানীরা এটা নিয়ে একটা গবেষণা করেন যা Scientific Reports জার্নালে প্রকাশিত হয়। গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন প্রফেসর ক্যারেন ম্যাককম্ব এবং ড. তাসমিন হামফ্রে।

দুটো এক্সপেরিমেন্ট করা হয়:

১. প্রথমটিতে ২১টা বিড়াল এবং তাদের মালিকদের নিয়ে। মালিকরা বিড়ালের দিকে তাকিয়ে স্লো ব্লিঙ্ক করেন। ফলাফল: বিড়ালরা মালিকদের স্লো ব্লিঙ্কের জবাবে নিজেরাও স্লো ব্লিঙ্ক করে – যা নরমাল ইন্টারঅ্যাকশনের চেয়ে অনেক বেশি।

২. দ্বিতীয়টিতে অপরিচিত গবেষক বিড়ালদের সাথে স্লো ব্লিঙ্ক করেন এবং হাত বাড়ান। ফলাফল: বিড়ালরা নিরপেক্ষ মুখের চেয়ে স্লো ব্লিঙ্কের পর অনেক বেশি গবেষকের কাছে আসে এবং হাতে ছোঁয়।

গবেষণায় দেখা গেছে যে স্লো ব্লিঙ্ক পজিটিভ ইমোশনাল কমিউনিকেশনের একটা ফর্ম। এটা বিড়ালের ওয়েলফেয়ার বাড়াতে সাহায্য করতে পারে, বিশেষ করে শেল্টার বা ভেটেরিনারি ক্লিনিকে।

আরেকটা গবেষণায় দেখা গেছে যে শেল্টারের বিড়ালরা যারা বেশি স্লো ব্লিঙ্ক করে, তাদের অ্যাডপশন অনেক তাড়াতাড়ি হয়!

আরো পড়ুন - বাংলাদেশের ৫ ট ক্যাটফুড ব্র্যান্ডের অনেস্ট রিভিউ

কেন বিড়ালরা স্লো ব্লিঙ্ক করে? ইভোলিউশনারি কারণ

বিড়ালরা মূলত সলিটারি প্রাণী – তাদের পূর্বপুরুষ উত্তর আফ্রিকান ওয়াইল্ডক্যাট একা থাকতে পছন্দ করে। কিন্তু ডোমেস্টিকেশনের কারণে তারা মানুষের সাথে বন্ড গড়ে তুলেছে। স্লো ব্লিঙ্ক হয়তো এমন একটা আচরণ যা বিড়ালরা মানুষের পজিটিভ রেসপন্স পেয়ে শিখেছে।

বিড়ালরা সরাসরি তাকিয়ে থাকাকে থ্রেট মনে করে, তাই চোখ বন্ধ করে তারা বলে যে তারা ভালনারেবল (দুর্বল) হয়েও নিরাপদ বোধ করে। এটা মানুষের ডুচেন স্মাইলের মতো – যেখানে চোখের কোণে কুঁচকে যায়।

কীভাবে আপনি আপনার বিড়ালকে স্লো ব্লিঙ্ক করবেন? স্টেপ-বাই-স্টেপ গাইড

স্লো ব্লিঙ্ক করা খুব সহজ, এবং এটা করে আপনি আপনার বিড়ালের সাথে একটা স্পেশাল কানেকশন তৈরি করতে পারেন।

১. শান্ত পরিবেশ বেছে নিন: বিড়াল যখন রিল্যাক্সড থাকে (যেমন বিছানায় শুয়ে বা জানালার কাছে বসে), তখন করুন। জোর করে নয়।

২. দূরত্ব রাখুন: প্রায় ১-২ মিটার দূরে বসুন বা দাঁড়ান। খুব কাছে গেলে বিড়াল অস্বস্তি বোধ করতে পারে।

৩. চোখে চোখ রাখুন: বিড়াল যখন আপনার দিকে তাকাবে, তখন নরমভাবে তাকান। সরাসরি স্টেয়ার করবেন না – চোখ নরম করে হাসির মতো করুন।

৪. ধীরে চোখ বন্ধ করুন: চোখ অর্ধেক বন্ধ করে ধীরে পুরো বন্ধ করুন, ২-৩ সেকেন্ড ধরে রাখুন, তারপর ধীরে খুলুন।

৫. দূরে তাকান: চোখ খোলার পর সাইডে তাকান, যাতে থ্রেট না মনে হয়।

৬. রিপিট করুন: কয়েকবার করুন এবং দেখুন বিড়াল জবাব দেয় কি না

টিপস:

  • যদি বিড়াল জবাবে স্লো ব্লিঙ্ক করে, তাহলে হাত বাড়িয়ে দেখুন – সে কাছে আসতে পারে।
  • নার্ভাস বা নতুন বিড়ালের সাথে ধৈর্য ধরুন। প্রথমে কয়েকদিন লাগতে পারে।
  • চশমা পরে থাকলে চশমা খুলে হাতে ধরুন যাতে বিড়াল আপনার গন্ধ পায়।

স্লো ব্লিঙ্কের উপকারিতা: বন্ড বাড়ানো ছাড়াও কী কী?

  • বন্ড মজবুত করে: নিয়মিত স্লো ব্লিঙ্ক করে বিড়ালের সাথে আপনার সম্পর্ক আরও গভীর হয়। বিড়াল আপনাকে বেশি বিশ্বাস করবে।
  • স্ট্রেস কমায়: ভয় পাওয়া বা স্ট্রেসড বিড়ালকে শান্ত করতে সাহায্য করে।
  • শেল্টারে সাহায্য: অ্যাডপশন সেন্টারে এটা করে বিড়ালরা তাড়াতাড়ি ঘর পায়।
  • অপরিচিত বিড়ালের সাথে: রাস্তার বিড়ালের সাথে বন্ড করতে চাইলে এটা ট্রাই করুন (দূর থেকে)।
  • স্বাস্থ্যের ইঙ্গিত: ঘন ঘন স্লো ব্লিঙ্ক মানে বিড়াল সুখী এবং স্বাস্থ্যবান।

অন্যান্য বিড়ালের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ যা স্লো ব্লিঙ্কের সাথে মিলে যায়

স্লো ব্লিঙ্ক একা নয় – এটা অন্য সিগন্যালের সাথে মিলে পুরো ছবি দেয়:

  • রিল্যাক্সড কান এবং লেজ: কান সোজা, লেজ শান্ত।
  • পারিং: সুখের শব্দ।
  • হেড বাম্প বা রাবিং: অ্যাফেকশন।
  • বিপরীতে, দ্রুত ব্লিঙ্ক বা চোখ বড় করে তাকানো মানে অস্বস্তি।

সাধারণ ভুল ধারণা এবং সমস্যা সমাধান

  • সব বিড়াল একই রকম নয়: কিছু বিড়াল বেশি অ্যাফেকশনেট, কিছু কম। যদি আপনার বিড়াল না করে, তাহলে অন্য উপায়ে বন্ড করুন (প্লে, ট্রিট)।
  • ভুল করে স্টেয়ার করবেন না: এটা থ্রেট মনে হয়।
  • বাচ্চা বা নতুন বিড়াল: ধৈর্য ধরুন, সময় লাগবে।
  • যদি বিড়াল অসুস্থ হয় বা চোখে সমস্যা থাকে, তাহলে ভেটের কাছে যান।

স্লো ব্লিঙ্ক বিড়ালের ভাষায় একটা সুন্দর "আই লাভ ইউ"। বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে এটা করে আমরা বিড়ালের সাথে আরও ভালো কমিউনিকেট করতে পারি। আজই আপনার বিড়ালের সাথে বসে ট্রাই করুন – দেখবেন সে জবাবে একটা মিষ্টি স্লো ব্লিঙ্ক দেবে!

আপনার অভিজ্ঞতা কী? কমেন্টে শেয়ার করুন। বিড়ালের সাথে আপনার বন্ড আরও মজবুত হোক!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ